রোহন মেসেজটা দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমি দেখছি।”সে ফোনটা হাতে নিয়ে টাইপ করল: “কে আপনি?”উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে:“দরজা খোলো। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। আর বেশি সময় নেই।”সুজাতা আর রিনা আন্টি দুজনেই ভয়ে কাঁপছিল।
রিনা আন্টি ফিসফিস করে বলল, “খুলিস না রোহন…কিন্তু রোহন আর অপেক্ষা করল না। সে দরজার কাছে গিয়ে চেইন লাগিয়ে রেখে খুব সামান্য ফাঁক করে দেখল।
বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল — বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি গার্ড, শ্যামল। বয়স প্রায় ৪৫। চোখে চশমা, মুখ গম্ভীর।শ্যামল নিচু গলায় বলল, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি ভিতরে আসতে চাই। কথা আছে।”রোহন দরজা খুলে দিল। শ্যামল ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তার হাতে একটা পুরনো মোবাইল ফোন।ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শ্যামল শান্ত গলায় বলল:“আমিই সব শুনেছি।
গতকাল রাতে, পরশু রাতে… আরও আগেও। তোমাদের ঘরের আওয়াজ আমার কেবিন থেকে স্পষ্ট শোনা যায়। আমি অনেকদিন ধরে জানি — সুজাতা দিদি আর তার ছেলে… আর গতকাল রিনা দিদিও ছিল।”সুজাতার মুখ একদম সাদা হয়ে গেল। রিনা আন্টি সোফায় বসে পড়ল।রোহন শক্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কী চাও?
টাকা?”শ্যামল মাথা নাড়ল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,“না। টাকা চাই না।”সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল:“আমার মেয়ে… বয়স ১৯। নাম প্রিয়া। সে তোমার কলেজেই পড়ে, রোহন। কিন্তু সে খুব অসুস্থ। কিডনির সমস্যা। টাকার খুব দরকার। আমি অনেকদিন ধরে চিন্তা করছিলাম কীভাবে তোমাদের কাছে সাহায্য চাইব।
কিন্তু সাহস পাইনি।”“গতকাল রাতে যখন সব শুনলাম, তখন আমার মাথায় একটা বাজে চিন্তা এসেছিল — তোমাদের ব্ল্যাকমেল করব। কিন্তু পরে মনে হলো, এভাবে করলে আমি নিজেও একটা নোংরা মানুষ হয়ে যাব। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সত্যি কথা বলব।”শ্যামল তার ফোনটা রোহনের দিকে এগিয়ে দিল। ফোনে কয়েকটা অডিও রেকর্ডিং ছিল — গতকাল রাতের তাদের চিৎকার, নোংরা কথা, সব।“এগুলো আমি ডিলিট করে দিতে পারি। কিন্তু আমার মেয়ের চিকিৎসার জন্য তোমাদের সাহায্য চাই। আমি কাউকে কিছু বলব না। তোমাদের সিক্রেট আমার কাছে নিরাপদ থাকবে। শুধু… একবার সাহায্য করো।”
ঘরের মধ্যে আবার ভারী নীরবতা নেমে এল। বাইরে বৃষ্টি তখনও জোরে পড়ছে।সুজাতা কাঁপা গলায় বলল, “তোমার মেয়ের কত টাকা দরকার?”শ্যামল মাথা নিচু করে বলল, “প্রথম দফায় প্রায় দেড় লাখ। পরে আরও লাগবে।”রোহন রিনা আন্টির দিকে তাকাল। তারপর মায়ের দিকে।ঠিক তখনই লিফটের দরজা খোলার আওয়াজ হলো। বাবার জুতোর শব্দ করিডরে। বাবা আগে চলে এসেছে।শ্যামল দ্রুত বলল, “আমি পিছনের বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। তোমরা সিদ্ধান্ত নাও। কাল সকালে আমাকে জানিয়ো।”শ্যামল দ্রুত বেরিয়ে গেল।বাবা দরজায় বেল বাজাল।
বাবার বেলের আওয়াজটা যেন বজ্রপাতের মতো লাগল তাদের কাছে।দিং-ডং… দিং-ডং…রোহন, সুজাতা আর রিনা আন্টি তিনজনেই চমকে উঠল। শ্যামল পিছনের বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর মাত্র এক মিনিট হয়েছে।সুজাতা দ্রুত রিনা আন্টিকে বলল, “তুমি রোহনের ঘরে গিয়ে বসো। দরজা ভেজিয়ে রাখো।”রিনা আন্টি দ্রুত রোহনের ঘরে ঢুকে দরজা আধখোলা করে রাখল। রোহন দ্রুত লাইটের সুইচ অন করল, কিন্তু লোডশেডিং চলছে। সে দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে ডাইনিং টেবিলে রাখল। হলুদ আলোয় পুরো ঘরটা অদ্ভুতভাবে ছায়া-ছায়া হয়ে গেল।সুজাতা দরজার কাছে গিয়ে গভীর শ্বাস নিয়ে দরজা খুলল।
বাবা — অরুণ — দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। তার চুল আর কোট বৃষ্টিতে ভিজে সপসপ করছে। হাতে একটা বড় ট্রলি ব্যাগ আর ল্যাপটপের ব্যাগ। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে স্বাভাবিক হাসি।“কী রে? এত দেরি করলি দরজা খুলতে?” অরুণ ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল। তার গলায় সামান্য সন্দেহের ছোঁয়া।সুজাতা জোর করে হাসল, “না… লোডশেডিং হয়েছে তো, অন্ধকারে খুঁজে পাচ্ছিলাম। এসো, ভিজে গেছ যে!”অরুণ জুতো খুলতে খুলতে চারপাশে তাকাল। তার চোখটা একটু সরু হয়ে গেল।
“ঘরের মধ্যে এত গরম লাগছে কেন? আর এই অদ্ভুত গন্ধটা কীসের?”সুজাতা দ্রুত বলল, “আজকে রান্না করতে গিয়ে একটু ধোঁয়া হয়েছে। জানালা খুলে দাও।”রোহন এগিয়ে এসে বাবার ব্যাগ নিতে গেল। “বাবা, তুমি তো বলেছিলে পরশু আসবে?”অরুণ কোট খুলতে খুলতে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু মিটিংটা ক্যানসেল হয়ে গেল। তাই তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম।”সে হঠাৎ থেমে গিয়ে নাক কুঁচকাল। “এই গন্ধটা… খুব চেনা চেনা লাগছে। মেয়েলি পারফিউমের মতো?
অরুণ সোফায় বসে পা ছড়িয়ে দিল। তার চোখটা ঘরের চারপাশে ঘুরছিল। মেঝেতে একটা ছোট্ট দাগ — গত রাতের কোনো রসের দাগ, যেটা পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। অরুণ সেটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
“রোহন, তোর ঘরে আলো জ্বলছে কেন? লোডশেডিং তো সারা বিল্ডিংয়ে।”রোহন দ্রুত বলল, “না বাবা, আমি মোমবাতি জ্বালিয়েছি।”অরুণ উঠে দাঁড়াল। “আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসি। তারপর খাবার দাও। খুব খিদে পেয়েছে।”সে বাথরুমের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ রোহনের ঘরের দরজার সামনে থেমে গেল। দরজাটা আধখোলা। ভিতরে রিনা আন্টি চুপ করে বসে আছে।অরুণ দরজাটা আরেকটু ঠেলে ভিতরে উঁকি দিল।“রিনা? তুমি এখানে?”রিনা আন্টি জোর করে হাসল, “হ্যাঁ… সুজাতার সাথে গল্প করছিলাম। লোডশেডিংয়ে একা বসে থাকতে ভয় লাগছিল।”অরুণ কয়েক সেকেন্ড তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
